স্টাফ রিপোর্টার : ‘চাঁদার টাকা দিলে প্রত্যাহার, নতুবা পুনরায় হয় অভিযোগ। পরে স্থানীয় ভাবে শালিস বৈঠকের মাধ্যমে আদায় হয় দাবীকৃত চাঁদার টাকা।’ অভিনব পদ্ধতিতে এভাবেই গত তিন বছর ধরে মামলা, হামলা আর ভূয়া অভিযোগে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন কাতার প্রবাসী খোরশেদ ও তার পরিবার। লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৬ ওয়ার্ডের সুলতান কমিশনার সড়কে জমি কিনে বাড়ী করতে এসে এমনই নির্যাতন আর হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেছেন কাতার প্রবাসী খোরশেদের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ও আত্মীয় মঞ্জু হোসেন।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ভবন নির্মাণে আইনের লঙ্ঘনের জনৈক ব্যক্তির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৩ নভেম্বর রবিবার প্রবাসী খোরশেদের নির্মাণাধীন ভবন সরজমিন পরিদর্শনে গেলে এমন হয়রানির কথা জানান ভুক্তভোগীরা।
তারা বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মাদকসেবী রেজাউল করিম বাবু ও তার সহযোগীদের দ্বারা এ ধরণের হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।
প্রবাসী খোরশেদের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বলেন, গত ২০২২ সালে পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের মৃত. শামছুল করিমের ছেলে শাকিল ও তাঁর স্ত্রী রুনা আক্তার থেকে জমিটি ক্রয় করেন খোরশেদ। যা বাঞ্চানগর মৌজার সাবেক ৯৯১১ নং খতিয়ানের ৮৩৫৭ দাগ ও আর.এস ৩৭৫২ খতিয়ানের ১১০২৩ এবং ১১০২৪ দাগে
সোয়া চার শতাংশ জমি। জমিটি ২০১৯ সালে শাকিল ও রুনা আক্তার ক্রয় করেছেন রেজাউল করিম বাবুর কাছ থেকে। এছাড়া রেজাউল করিম বাবু ও মোখলেছুর রহমানের ছেলে মহরম আলী থেকে ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা দিয়ে আরো ০.১৪৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন খোরশেদ। যা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ হয় উভয় পক্ষ। তবে এখনো ওই জমিটি খোরশেদকে রেজিস্ট্রি দেয়নি তারা।
স্বপ্না আরো বলেন, চাঁদাবাজ রেজাউল ও তাঁর সহযোগীদের যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ আমরা। রেজাউল আমাদের জমি বুঝিয়ে না দিয়ে বারবার পৌরসভায় মিথ্যা অভিযোগ ও আদালতে মামলা দিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করছেন। আবার চাঁদার টাকা দিলে সেগুলো নিজেই প্রত্যাহার করে নেন। এখন আবার নতুন করে পৌরসভায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাদের বাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
জানা গেছে, নিজ ক্রয়কৃত জমিতে খোরশেদ বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ করছেন। ইতোমধ্যে ২য় তলার কাজ শেষ হয়ে ৩য় তলার কাজ চলছে। এ অবস্থায় ইমারত নির্মাণ বিধি লঙ্ঘনের কথা বলে পৌরসভায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন রেজাউল। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন প্রকার তদন্ত বা পরিমাপ ছাড়াই প্রবাসী খোরশেদের বাড়ীর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রড, সিমেন্টসহ প্রায় দশ লাখ টাকার নির্মাণ সামগ্রী।
প্রবাসী খোরশেদ’র আত্মীয় মঞ্জু হোসেন অভিযোগ করে বলেন, জমি ক্রয় পরবর্তী একাধিকবার চাঁদার টাকা দিতে হয়েছে রেজাউল ও তার সহযোগিদেরকে। স্থানীয় বাসিন্দা না হওয়ায় জমি রক্ষা ও পরিবারের নিরাপত্তায় চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছেন খোরশেদ। প্রতিবারই একই কৌশলে দাবিকৃত চাঁদার টাকা আদায় করেন তারা। আর তা হলো পৌরসভায় অভিযোগ বা আদালতে মামলা। পরক্ষণে স্থানীয়ভাবে শালিস বসিয়ে দাবিকৃত চাঁদার টাকা আদায়। আর টাকা পেলে অভিযোগ বা মামলা প্রত্যাহার। কিছু দিন পর পর চলতে থাকে তাদের এ ধরণের অত্যাচার।
চলতি বছরের জুলাই মাসে পুনরায় ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করায় রেজাউলকে আসামী করে লক্ষ্মীপুর আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন খোরশেদ। যা এখনো চলমান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইমারত নির্মাণ আইন অমান্যের বিষয় উল্লেখ করে পৌরসভায় মিথ্যা অভিযোগ দেন রেজাউল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পৌর কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার তদন্ত কিংবা পরিমাপ ছাড়াই খোরশেদের বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। ফলে রড, সিমেন্টসহ দশ লাখ টাকার নির্মাণ সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, খোরশেদের ক্রয়কৃত জমি বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো পৌরসভা ও আদালতে একাধিক অভিযোগ দিয়েছেন রেজাউল। প্রত্যেকবার মোটা অংকের টাকা আদায় করে অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নিতেন তিনি। অথচ রেজাউল নিজেই তার বাড়ি নির্মাণের সময় ইমারত নির্মাণ আইন ভঙ্গ করেছেন। অন্যের বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে দেয়াল তুলেছেন এবং সরকারি রাস্তার ওপর ছাদ দিয়ে বিল্ডিং নির্মাণ করেছেন। অথচ এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ নির্বকার!
স্থানীয় বাসিন্দা এমরান হোসেন বলেন, রেজাউল প্রবাসী খোরশেদের জমি বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো হয়রানি করছে। কয়েক দফায় বিভিন্ন অযুহাতে চাঁদাও (টাকা) নিয়েছে। এখন আবার পৌরসভায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাঁদা দাবি করছে সে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রেজাউলদের বারবার চাঁদার টাকা দেওয়াই কাল হয়েছে প্রবাসী খোরশেদের। এখন কিছুদিন পর পরই তারা খোরশেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া অভিযোগ দেয়। আর চাহিদা অনুযায়ী টাকা পেলে সেটি প্রত্যাহারও করে নেয়। রেজাউলরা প্রভাবশালী ও মাদকসেবী হওয়ায় তাদের ভয়ে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না কেউ।
স্থানীয় আমিন (জমি পরিমাপক) মনিরুল ইসলাম বলেন, খোরশেদের ক্রয়কৃত সোয়া ৪ শতাংশ জমি তাঁর ভোগদখলে পাওয়া যায়নি। তখন রেজাউল ও শালিসদারদের নির্দেশে রাস্তার জমি পরিমাপ করে খোরশেদকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আইনগতভাবে সরকারি জমি বিক্রি ও কাউকে মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে রেজাউল করিম বাবু বলেন, খোরশেদ ইমারত নির্মাণ আইন অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। এজন্য পৌরসভায় অভিযোগ দিয়েছি। তাই আমার নামে মিথ্যা চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলছে তারা।
তবে চাঁদা দাবীর বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে চাঁদা নয় প্রবাসী খোরশেদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাওলাত হিসাবে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন অভিযুক্ত রেজাউল। তিনি আরো বলেন, আমি জমি বিক্রি করেছি শাকিলের কাছে। তাই খোরশেদকে জমি বুঝিয়ে দিবো কেন? তবে সমঝোতা ও মনের মিল থাকলে অনেক কিছু হয়। কিন্তু খোরশেদের সঙ্গে মনের মিল নেই।
তবে সমঝোতা কি চাঁদা দেওয়া? এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি রেজাউল।
খোরশেদের বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের বিষয়ে কোন বক্তব্য জানা যায়নি লক্ষ্মীপুর পৌরসভা কর্তৃপক্ষের থেকে। তবে এসব বিষয়ে লক্ষ্মীপুর শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিশ্বেশ্বর দাস চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি জানা নেই। তবে কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্ত রেজাউর করিম বাবু লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডস্থ বাঞ্চানগর গ্রামের নুর মোহাম্মদের ছেলে।
ভুক্তভোগী কাতার প্রবাসী খোরশেদ লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডস্থ দক্ষিণ বাঞ্চানগর গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে।
















