মহামারী থেকে বাঁচতে ১০টি উপদেশ

মূল : ড. আব্দুর রাযযাক ইবন আব্দুল মুহসিন আল-বাদর অনুবাদ : আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর  জন্য, যিনি অসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে তাকে ডাকে। দুঃখ-ভারাক্রান্ত মানুষকে সাহায্য করেন, যখন সে তাকে ডাকে। যিনি বিপদাপদ দূর করেন এবং দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন। যার যিকির ছাড়া হৃদয়সমূহ প্রাণবন্ত হয় না। যার অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই সঙ্ঘটিত হয় না। যার রহমত ছাড়া দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। যার রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কোনো কিছুই সুরক্ষিত থাকে না। যার সহজীকরণ ছাড়া কাক্সিক্ষত কোনো কিছুই লাভ করা যায় না। যার আনুগত্য ছাড়া কোনো সমৃদ্ধিই অর্জিত হয় না।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হক্ব কোনো মা‘বূদ নেই আল্লাহ ছাড়া, যিনি এক, যার কোনো শরীক নেই। যিনি বিশ্বজগতের রব, আগের ও পরের সকলেরই মা‘বূদ। আসমানসমূহ ও যমীনসমূহের সর্বদা রক্ষণাবেক্ষণকারী।

আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। যিনি সুস্পষ্ট কিতাব ও সরল-সঠিক পথ নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তার উপর, তার পরিবার-পরিজন ও সকল ছাহাবীর উপর ছালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।

এগুলো কিছু উপকারী উপদেশ, যেগুলো বর্তমান সময়ের আলোচিত ‘করোনা’ ভাইরাসের ব্যাপারে মানুষের ভয়-ভীতি উপলক্ষ্যে আমি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।

আমরা মহান আল্লাহর   কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ও সব জায়গার মুসলিমদের প্রত্যেকটি বালা-মুছীবত দূর করে দেন। আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন। তিনি যেন আমাদেরকে সেভাবে হেফাযত করেন, যেভাবে তিনি তার নেক বান্দাদেরকে হেফাযত করে থাকেন। নিশ্চয়ই তিনি এর একমাত্র অভিভাবক এবং তিনিই এর উপর ক্ষমতাবান।

১. বালা-মুছীবত আসার আগে যা বলতে হবে:

উছমান ইবনে আফফান প থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি (সন্ধ্যায়) ৩ বার পড়বে,

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَىْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.

(উচ্চারণ: বিস্মিল্লা-হিল্লাযী লা- ইয়ার্যুরু মা‘আসমিহী শাইউন ফিল্ আরযি ওয়া লা- ফিস্-সামা-ই ওয়া হুওয়াস সামী‘উল ‘আলীম। অর্থ: ‘আমি আল্লাহর   নামে শুরু করছি, যার নামে শুরু করলে আসমান ও যমীনের কোনো কিছুই কোনোরূপ ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।), সকাল পর্যন্ত তার হঠাৎ কোনো বালা-মুছীবত স্পর্শ করবে না। আর যে এগুলো সকালে ৩ বার পড়বে, সন্ধ্যা পর্যন্ত তার হঠাৎ কোনো বালা-মুছীবত স্পর্শ করবে না (আবুদাঊদ)।

২. বেশী বেশী করে নিম্ববর্ণিত দোআটি পড়তে হবে:

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْنَ.

(উচ্চারণ: লা- ইলা-হা ইল্লা-আনতা সুব্হা-নাকা ইন্নী কুনতু মিনায য-লিমীন। অর্থ: ‘তুমি (আল্লাহ) ব্যতীত কোনো মা‘বূদ নেই। তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি। নিশ্চয়ই আমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত)।

মহান আল্লাহ বলেন, وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ – فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ.  ‘আর স্মরণ করো যুন-নূনের (মাছওয়ালা ইউনুসের) কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করবো না। অতঃপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, তুমি ছাড়া কোনো (হক্ব) উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, মহান! নিশ্চয়ই আমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি’ (আল-আম্বিয়া, ২১/৮৭-৮৮)।

ইবনু কাছীর (রহিঃ) তার তাফসীরে وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ ‘আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি’ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ যখন তারা কঠিন পরিস্থিতিতে থাকে এবং আমার নিকট বিনয়াবনত হয়ে আমাকে ডাকে, বিশেষ করে বালা-মুছীবতের সময় যখন তারা এই দো‘আর মাধ্যকে ডাকে, (তখন আমি তাদেরকে উদ্ধার করি)’। এরপর তিনি একটি হাদীছ উল্লেখ করেন, যেখানে নবী (ছাঃ) বলেন, , دَعْوَةُ ذِي النُّونِ إِذْ دَعَا وَهُوَ فِي بَطْنِ الحُوتِ: لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ، فَإِنَّهُ لَمْ يَدْعُ بِهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلاَّ اسْتَجَابَ اللَّهُ لَهُ  ‘যুন নূন মাছের পেটে যে দো‘আ করেছিলেন, তা হচ্ছে- لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ কোনো মুসলিম যখন এই দো‘আ করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দো‘আ কবুল করে থাকেন’ (আহমাদ, তিরমিযী)।

আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) তার ‘আল-ফাওয়াইদ’ গ্রন্থে বলেন, ‘তাওহীদের মত অন্য কিছু দিয়ে দুনিয়ার বিপদাপদ দূর করা যায় না। একারণে ‘দো‘আউল কারব’ বা বিপদাপদ থেকে মুক্তির দো‘আ তাওহীদের বাক্য দিয়েই হয়ে থাকে। আর যুন নূনের দো‘আও তাওহীদের বাক্য দিয়েই ছিল, যে দো‘আটি দুঃখ-কষ্টে পতিত কোনো ব্যক্তি পড়লে আল্লাহ তার দুঃখ-কষ্টকে দূর করে থাকেন। পক্ষান্তরে শিরক ছাড়া অন্য কিছু বড় বড় বিপদাপদে ফেলে না এবং তাওহীদ ছাড়া অন্য কিছু তা থেকে মুক্তি দিতে পারে না। অতএব, তাওহীদই হচ্ছে সৃষ্টিজীবের আশ্রয়স্থল, তার দূর্গ ও রক্ষাকবচ। তাওফীক্ব কেবল আল্লাহর  পক্ষ থেকেই আসে’।

৩. বালা-মুছীবতের কষ্ট-ক্লেশ থেকে আশ্রয় চাইতে হবে:

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বিপদাপদের কষ্ট, দুর্ভাগ্যের আক্রমণ, মন্দ ফায়ছালা ও বিপদাপদে শত্রুর হাসি থেকে (আল্লাহর   নিকট) আশ্রয় চাইতেন (বুখারী)।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর  নিকট বিপদাপদের কষ্ট, দুর্ভাগ্যের আক্রমণ, মন্দ ফায়ছালা ও বিপদাপদে শত্রুর হাসি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো’ (বুখারী)।

[দো‘আটি এভাবে পড়া যাবে-

اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلاَءِ وَدَرَكِ الشَّقَاءِ وَسُوْءِ القَضَاءِ وَشَمَاتَةِ الْأَعْدَاءِ

(উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিন্ জাহদিল বালা ওয়া দারাকিশ শাক্বা ওয়া সুইল ক্বযা ওয়া শামা-তাতিল আ‘দা। অর্থ: ‘আমি আল্লাহর   নিকট আশ্রয় চাই বিপদের কষ্ট, দুর্ভাগ্যের আক্রমণ, মন্দ ফায়ছালা ও বিপদে শত্রুর হাসি থেকে)-অনুবাদক।]

৪. বাড়ী থেকে বের হওয়ার দোআ পড়ার প্রতি যত্নবান হতে হবে:

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি তার বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময়ে বলে,

بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ.

(উচ্চারণ: বিস্মিল্লা-হি তাওয়াক্কাল্তু ‘আলাল্লা-হ, লা- হাওলা ওয়ালা- কুওওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ। অর্থ: ‘আল্লাহর   নামে বের হলাম, তার উপর ভরসা করলাম। আমার কোনো উপায় এবং ক্ষমতা নেই আল্লাহ ব্যতীত’), তখন তাকে বলা হয়, তোমাকে পথ দেখানো হলো, তোমার জন্য যথেষ্ট করে দেওয়া হলো এবং তোমাকে সুরক্ষিত করা হলো। ফলে শয়তান তার নিকট থেকে দূরে সরে যায় এবং অন্য শয়তান এই শয়তানকে বলে, তুমি ঐ ব্যক্তির কী করবে, যাকে পথ দেখানো হয়েছে, উপায় বাতলে দেওয়া হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে?!’ (আবুদাঊদ)।

৫. সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর   কাছে সুস্থতা ও নিরাপত্তা কামনা করতে হবে:

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সকাল-সন্ধ্যায় রাসূল (ছাঃ) এই দো‘আগুলো কখনো ছাড়তেন না-

اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي وَمَالِي، اَللّٰهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي، وَآمِنْ رَوْعَاتِي، اَللّٰهُمَّ احْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ، وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي، وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي.

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকাল্ ‘আ-ফিইয়াতা ফিদ্ দুন্ইয়া- ওয়াল্ আ-খিরাহ, আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকাল ‘আফ্ওয়া ওয়াল ‘আ-ফিইয়াতা ফী দ্বীনী ওয়া দুন্ইয়া-ইয়া ওয়া আহলী ওয়া মা-লী আল্লা-হুম্মাসতুর ‘আওরা-তী ওয়া আ-মিন রও‘আতী আল্লা-হুম্মাহফাযনী মিম্ বায়নি ইয়াদাইয়্যা ওয়া মিন খলফী ওয়া ‘আন ইয়ামীনী ওয়া ‘আন শিমা-লী ওয়া মিন ফাওক্বী ওয়া আ‘ঊযু বি‘আয্মাতিকা আন উগতা-লা মিন তাহতী।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা চাই। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার ও সম্পদের ব্যাপারে নিরাপত্তা চাই। হে আল্লাহ! তুমি আমার গোপন দোষসমূহ ঢেকে রাখো এবং ভীতিপ্রদ বিষয়সমূহ থেকে আমাকে নিরাপদে রাখো। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে হেফাযত কর আমার সম্মুখ হতে, ডানদিক হতে, বাম দিক হতে এবং আমার উপর দিক হতে। হে আল্লাহ! আমি তোমার মহানত্বের নিকট আশ্রয় চাই মাটিতে ধ্বসে যাওয়া হতে’ (আহমাদ)।

৬. বেশী বেশী দোআ করতে হবে: 

ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার জন্য দো‘আর দরজা খুলে দেওয়া হয়, তার জন্য রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আল্লাহর   নিকট সবচেয়ে প্রিয় যাঞ্চা হলো সুস্থতা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করা’। তিনি আরো বলেন, ‘যে বিপদ আপতিত হয়েছে এবং যা এখনও আপতিত হয়নি, সবক্ষেত্রেই দো‘আতে উপকার হয়। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা দো‘আকে আবশ্যক করে নাও’ (তিরমিযী)।

৭. মহামারীর স্থানসমূহ এড়িয়ে চলতে হবে:

আব্দুল্লাহ ইবনে আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ওমর (রাঃ) শামের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তিনি সারগ এলাকায় পৌঁছলে তার কাছে খবর এলো যে, শামে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তখন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) তাকে সংবাদ দিলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারীর প্রাদুর্ভাবের কথা শোনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে এবং তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে পলায়ন করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না’ (বুখারী)।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘পালের মালিক অসুস্থ উট অন্য মালিকের সুস্থ উটপালের নিকট নিয়ে আসবে না’ (বুখারী ও মুসলিম)।

৮. বেশী বেশী করে ভালো কাজ করতে হবে এবং অনুগ্রহ করতে হবে:

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাঃ) বলেছেন, ‘বিভিন্ন রকমের ভালো কাজ অপমৃত্যু, বিপদাপদ ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করে। আর দুনিয়ায় ভালো কাজ সম্পাদনকারীরাই পরকালে কল্যাণের অধিকারী হবে’ (হাকেম)।

ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহিঃ) বলেন, ‘রোগ-ব্যাধির একটা বড় চিকিৎসা হলো, ভালো কাজ করা, অনুগ্রহ করা, যিকির করা, দো‘আ করা, আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হওয়া, কাকুতি-মিনতি করা ও তাওবা করা। অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধ ও আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ঔষধের চেয়ে এগুলোর প্রভাব অনেক বেশী। কিন্তু তা হয়ে থাকে ব্যক্তির মানসিক প্রস্তুতি, সেগুলো গ্রহণ এবং উপকারের ক্ষেত্রে তার বিশ্বাস অনুযায়ী’ (যাদুল মা‘আদ)।

৯. তাহাজ্জুদের ছালাত পড়তে হবে:

বেলাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের রাতের ছালাত (তাহাজ্জুদ) পড়া উচিত। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককারদের অনুসৃত রীতি। রাতের ছালাত আল্লাহর  নৈকট্যলাভ ও গোনাহ থেকে বাঁচার উপায়, পাপকাজের কাফফারা এবং শারীরিক রোগের প্রতিরোধক’ (তিরমিযী)।

১০. খাবারপাত্র ও পানপাত্র ঢেকে রাখতে হবে:

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা পাত্র ঢেকে রাখবে এবং মশকের মুখ বেঁধে রাখবে। কেননা বছরে একটি রাত আছে, যে রাতে মহামারী আপতিত হয়। যে কোনো অনাবৃত পাত্র এবং বন্ধনমুক্ত মশকের উপর দিয়ে তা অতিক্রম করে, তাতেই সে মহামারী নেমে আসে’ (মুসলিম)।

ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহিঃ) বলেন, এটা এমন একটা বিষয়, যে পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানও পৌঁছতে পারেনি’ (যাদুল মা‘আদ)।

পরিশেষে, প্রতিটি মুসলিমের উপর কর্তব্য হলো, আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাশী হয়ে তার উপর ভরসা করে নিজের সব বিষয়কে আল্লাহর   দিকেই সোপর্দ করা। মূলত সবকিছুই তার হাতে এবং তার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণাধীন। তার আরো কর্তব্য হলো, তার উপর আপতিত বালা-মুছীবতকে ধৈর্যের মাধ্যমে ও নেকীর আশায় মেনে নেওয়া। কেননা যে ধৈর্য ধরে এবং নেকীর আশা করে, মহান আল্লাহ তার জন্য অনেক প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন, إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ ‘ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে’ (আয-যুমার, ৩৯/১০)।

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবী (ছাঃ) বলেন, ‘এটি হচ্ছে এক রকমের আযাব, যা আল্লাহ যার উপর পাঠাতে চান, পাঠান। তবে, আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দিয়েছেন। অতএব, মহামারীতে আক্রান্ত যে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে তার এলাকায় অবস্থান করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার উপর আসবে না, তাহলে তার জন্য রয়েছে শহীদের ছওয়াবের সমান ছওয়াব’ (বুখারী)।

আমরা আল্লাহর   কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সবাইকে তার ভালোবাসা ও সন্তুষ্টিজনক সৎআমল ও উত্তম কথা বলার তাওফীক দান করেন। কেননা তিনিই সত্য বলেন এবং সঠিক পথের দিশা দেন।

সমস্ত প্রশংসা এক আল্লাহর   জন্য। আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তার পরিবার-পরিজন এবং তার ছাহাবীবর্গের উপর ছালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।

[সম্মানিত পাঠক! এখানেই মাননীয় লেখক ড. আব্দুর রাযযাক ইবনে আব্দুল মুহসিন আল-বাদরের বক্তব্য শেষ হলো। এক্ষণে আমি করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত ইউনিসেফের ৮টি উপদেশ আপনাদের খেদমতে আরয করতে চাই, যেগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের উপকারে আসবে বলে আশাবাদী। “করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। করোনা ভাইরাস খালি চোখে দেখা যায় না। এটি দেখা যায় ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, ভাইরাসটি শক্তিশালী হলেও এটিকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে ও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ইউনিসেফের ৮টি পরামর্শ হচ্ছে-

১. করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে- বাজারে এমন মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে। যতটা সম্ভব এসব মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

২. করোনা ভাইরাস সাধারণত মাটিতে অবস্থান করে। এটি বাতাসে ছড়ায় না। তাই ঘর-গৃহস্থালি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

৩. কোনো ধাতব পাত্রে বা বস্তুতে করোনা ভাইরাস পড়লে প্রায় ১২ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই সব সময় সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

৪. সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরতে হবে। কারণ করোনা ভাইরাস কাপড়ে ৯ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। ধোয়া কাপড় রোদে দুই ঘণ্টা শুকিয়ে নিতে পারলে ভাইরাসটি মারা যাবে।

৫. হাত বা ত্বকে এ ভাইরাসটি ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে। তাই অ্যালকোহল মিশ্রিত জীবাণুনাশক হাতে মেখে নিলে ভাইরাসটির মৃত্যু হবে। [1]

৬. গরম আবহাওয়ায় করোনা ভাইরাস টিকতে পারে না। করোনা ভাইরাসটির মৃত্যুর জন্য ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। তাই খাবার পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। সবসময় কুসুম গরম পানি পান করতে হবে। আইসক্রীম খাওয়া যাবে না। ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে।

৭. লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে প্রতিদিন গারগল করতে হবে। তাতে গলা পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি টনসিলের জীবাণুসহ করোনা ভাইরাসও দূরে থাকবে এবং ভাইরাসটি ফুসফুসে সংক্রমিত হতে পারবে না।

৮. করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বারবার নাকে, মুখে আঙুল বা হাত দেওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ নাক, মুখ আর চোখ দিয়েই মানুষের শরীরে বেশিরভাগ জীবাণু প্রবেশ করে।”-অনুবাদক]

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় বালা-মুছীবত থেকে রক্ষা করুন। আমীন!

[1]. অ্যালকোহলমুক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার করাই বেশী ভালো।

(সৌজন্যেঃ মাসিক আল-ইতিছাম)

এই জাতীয় আরো খবর

আপনার মতামত জানাতে পারেন।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.