বাঘের মুখ থেকে ছয় কিশোরকে উদ্ধারের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী

লক্ষ্মীপুর সময় ডেস্কঃ

অভিযানের শুরুতেই কিশোরদের বনের মধ্যে হাঁটা চলা না করে গাছে চড়ে বসে থাকার জন্য পরামর্শ দেয় পুলিশ।কারণ বনের চাঁদপাই রেঞ্জের ওই অংশে বাঘের চলাচল রয়েছে। কিন্তু কিছু সময় পরই শুরু হলো বৃষ্টি। নেমে এলো বনের মধ্যে অন্ধকার। এতে আরও ভড়কে গেলো তারা। এর মধ্যেই তাদের ফোনের নেটওয়ার্কও চলে যায়।

ওদিকে মোবাইল ফোনে কল করার জন্য একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এভাবে কাটল ঘণ্টাখানেক। পুলিশ তাদের সঙ্গে পুনরায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। একপর্যায়ে তারা জানায়, মাইকে এশার আজানের শব্দ শুনেছে তারা।এ কথা শুনে নতুন করে পরিকল্পনা করে পুলিশ।

কিন্তু সমস্যাটা হলো বনের ওই এলাকার পাশের লোকালয়ে দুই পাশে দুটি মসজিদ আছে। কাজেই কোন মাইকের শব্দ তারা শুনতে পেলো, সেটি জানতে পারলে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। এবার একপাশের মসজিদের মাইক দিয়ে তাদের ডাকা হলো। আর ফোনে জানতে চাওয়া হলো, আওয়াজ শোনা যায় কিনা? জবাব এলো, খুবই কম। এবার বনের অন্য পাশের মসজিদের মাইক দিয়ে ডাকা হলো। এবার মোবাইল ফোনে কিশোরেরা জানালো, তুলনামূলক স্পষ্ট শব্দ শুনতে পাচ্ছে তারা। এটার মাধ্যমে বনের মধ্যে তাদের অবস্থানটি কিছুটা আঁচ  করে নিলো পুলিশ। সুন্দরবনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে ৩-৪ কিলোমিটার পর্যন্ত শব্দ শোনা যায়। আর রাতে সেটি আরও গহীন থেকে শোনা যায়। তাই সুন্দরবনের ৪-৫ কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে থাকে পুলিশ।

সুন্দরবনের ভেতর হাঁটা সহজ নয়। কেওড়ার শ্বাসমূলের সঙ্গে লতাগুল্ম। ঝোপ-ঝাড় আর নানান ধরনের কাঁটা।রাতের অন্ধকারের সঙ্গে বৃষ্টি। পিচ্ছিল পথে এ যেন এক কণ্টকাকীর্ণ যাত্রা। কয়েক ঘন্টা ধরে সেই পথ পাড়ি দিয়ে বনের আরও ভেতরে গেল পুলিশ। এবার কল দিয়ে ওই কিশোরদের পুলিশ বললো, আমরা হাঁক দেব। যদি তোমরা শুনতে পাও তো তোমরাও হাঁক দেবে। পুলিশ বনের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে হাঁক দিল। কিন্তু ওই পাশ থেকে সাড়া নেই। ঘন্টা খানেক পর ওপাশ থেকেই হাঁকের জবাব এলো। এবার পুলিশ বুঝতে পারলো, কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। হাঁক দিতে দিতে একসময় হারিয়ে যাওয়া কিশোরদের খুঁজে পায় পুলিশ। ততক্ষণে যে রাত তিনটা বেজে গেছে।

দীর্ঘক্ষণ বনের মধ্যে এমন প্রতিকূল পরিবেশে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল কিশোররা। পুলিশ ধরাধরি করে তাদের নিয়ে থানায় ফিরতে ফিরতে রাত পেরিয়ে ভোর। অনেকক্ষণ কিছু না খেতে পেরে আরও ক্লান্ত তারা। থানায় এনে প্রাথমিক শুশ্রূষার পাশাপাশি খাবার খেতে দেয় পুলিশ। এরপর সকালে মিষ্টিমুখ করিয়ে কিশোরদের পরিবারের হাতে তুলে দেয়।

সন্তানদের ফিরে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের চোখে তখন আনন্দঅশ্রু। বুকে সন্তানদের জড়িয়ে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলেন তারা। জানালেন অশেষ কৃতজ্ঞতা।

থানা থেকে বিদায়বেলা হারিয়ে যাওয়া দলের এক তরুণ থমকে দাঁড়ালো। পুলিশকে লক্ষ্য করে বলল, বনের ভেতরে যখন হারিয়ে গিয়েছিলাম, তখন বারবার মনে হয়েছে এ জীবনে আর ফেরা হবে না। কিন্তু পুলিশের কারণে আমরা ছয় জন আবার নতুন জীবন পেলাম। আমি পড়াশোনা করে পুলিশ হতে চাই।বিপদে এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।

সূত্রঃ বাংলা নিউজ ২৪.কম।

এই জাতীয় আরো খবর

আপনার মতামত জানাতে পারেন।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.