চরম অর্থ কষ্টে লক্ষ্মীপুরের প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা

 করোনা ভাইরাস মহামারির লকডাউন এবং ছুটিতে থাকা প্রাইভেট ও নন এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা গত ২-৩ মাস যাবত বেতনভাতা পাচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে সব রকমের টিউশন। এমতাবস্থায় চরম অর্থ কষ্টে পড়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলার সাতশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। অনেকের সংসারই চলছে না।

সমাজে সম্মানীয় পেশার কারণে লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতেও পারছে না শিক্ষকরা। আবার কোন ধরনের সহায়তার তালিকায় তাদের নাম নেই। তবু অস্বচ্ছল শিক্ষক পরিবারের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
মঙ্গলবার(৫ মে) লক্ষ্মীপুর জেলার প্রাইভেট কিন্ডার গার্টেন স্কুল এবং নন এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষক নেতা মোবাইল ফোনে এমন তথ্য জানিয়েছেন।

মোঃ জামান (ছদ্মনাম) গরিব ঘরের মেধাবী সন্তান ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েছেন। সরকারী চাকুরী খুঁজতে খুজঁতে বয়স পার। বর্তমানে জেলার কমলনগর উপজেলার গ্লোবাল স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করছেন। কোন মতে পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন। কিন্ত গত ২ মাস প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেই। সামান্য বেতন ছাড়া আর কোন রোজগার নেই। তিনি জানান, সংসার চলছে না, এমন অভাব আগে কখনো দেখিনি। বাহিরে গিয়ে ত্রাণ চাওয়ার বাকী রয়েছে কিন্ত পারছি না।

জেলার চর লরেঞ্চ গ্লোবাল স্কুল এন্ড কলেজের সভাপতি হুমায়ুন কবির জানান, শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফি’র টাকা থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনভাতা পরিশোধ করা হয়। কিন্ত মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সেজন্য শিক্ষক কর্মচারীরা গত মার্চ, এপ্রিল মাসের বেতন পায়নি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ফেব্রুয়ারী মাসেও বেতন পায়নি। সামনে আর কত দিন এভাবে চলবে বলা যাচ্ছে না। শিক্ষকরা কিভাবে চলবে ?

জেলার তোরাবগঞ্জ অগ্রণী স্কুলের উদ্যোক্তা মোঃ সফিক উল্লাহ বিএসসি জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠানের ভবন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে না।

জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাইভেট স্কুল রায়পুর কাজী ফারুকী স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্চ মাসে মালিক অর্ধেক বেতন দিয়েছে। এখনো এপ্রিল বাকী। পরিবার পরিজন নিয়ে কত কষ্টে আছি বুঝাতে পারবো না। এবার ঈদ করা যাবে না।

লক্ষ্মীপুর শহরের একটি প্রাইভেট মাদরাসার শিক্ষক মোঃ হোসেন জানান, মা, ৩ সন্তান এবং স্ত্রী নিয়ে সামান্য বেতনে শহরের একটি বাসায় ভাড়া থাকি। শিক্ষকতা আর টিউশনিতে সংসার চলতো। এখন প্রতিষ্ঠানের বেতন এবং টিউশনি সবই বন্ধ। বাসা ভাড়া, সংসার খরচ, মায়ের ঔষধ খরচ কিছু নেই। আমাদের কথা কেউ ভাবে না।

লক্ষ্মীপুর প্রাইভেট স্কুল গুলোর সংগঠন ‘‘ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অফ লক্ষ্মীপুর প্রাইভেট স্কুল’’ এর সভাপতি মোঃ আবদুর রহমান জানান, স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি বন্ধ। শিক্ষকদেরকে বেতন দিতে পারছি না ২-৩ মাস ধরে। শিক্ষক কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।

লক্ষ্মীপুর জেলা নন এমপিও ভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক প্রধান মোঃ ফরিদ উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো যে দিনই খোলা হয় একদিনও না পড়ে ছাত্রছাত্রীরা বেতনভাতা দিবে না। কমপক্ষে আগামী ছয় মাস শিক্ষক সমাজ চরম অভাবে থাকবে। তিনি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্বচ্ছল অভিভাবকদেরকে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান।

শিক্ষকদের এমন দু:সময়ের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আবদুল মতিন জানান, আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক উপপরিচালক বরাবর আমি জানাবো।

অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মোঃ মাহফুজুর রহমান অসহায় শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক তালিকা প্রনয়ণ করে আবেদন করার জন্য পরার্মশ দেন। তিনি আরো জানান, সরকার কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তিকেই সহায়তার বাহিরে রাখবেনা। তবে বিষয়টি প্রশাসনকে জানাতে হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাইভেট স্কুলগুলোর সংগঠন এবং জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে প্রাইভেট এবং ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬শ ৯২টি। এগুলোর মধ্যে কিন্ডার গার্টেন এবং প্রাইভেট স্কুল, কলেজ, মাদরাসার প্রায় সাড়ে ৬শ। ননএমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৯টি এবং ননএমপিও মাদরসা ৬৩টি। এসকল প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।

সূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যার্ন্ডাড

এই জাতীয় আরো খবর

আপনার মতামত জানাতে পারেন।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.