করোনায় ‘ভুল গবেষণায়’ নড়বড়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা!

লক্ষ্মীপুর সময় ডেস্কঃ

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শতাধিক প্রতিষ্ঠান ওষুধ তৈরির জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন ওষুধ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি পুরনো বিভিন্ন ওষুধও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হচ্ছে। পুরাতন ওষুধগুলোর মধ্যে আলোচনায় রয়েছে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন।

ওষুধটি পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলমান থাকার এক পর্যায়ে গত ২৫ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হঠাৎ করে এর প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে। মূলত একটি মার্কিন কোম্পানির জরিপের ফলাফল দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সংস্থার জরিপ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য সন্দেহ দেখা দেয়ায় আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

মেডিকেল এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সার্জিস্ফিয়ার নামের একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের চালানো গবেষণাটি গত ২২ মে বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ‘ল্যানসেট’ ও ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’ এ প্রকাশ করা হয়। গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীদের হাইড্রোক্লোরোকুইন ব্যবহারের ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

সার্জিস্ফিয়ার দাবি করে, তারা বিশ্বের ১২০০টি হাসপাতালের ৯৬ হাজার রোগী ওপর এই গবেষণা চালিয়েছেন। ফলে তাদের এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয় এবং দুনিয়ার তাবৎ প্রতিষ্ঠান একটিকে গুরুত্ব দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সার্জিস্ফিয়ারের গবেষণাকে মূল্যায়ণ করে হাউড্রোক্লোরোকুইন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, কয়েক’শ হাসপাতাল ও কয়েক হাজার রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সুতারাং হাউড্রোক্লোকুইনের ট্রায়াল প্রয়োগ আপাতত বন্ধ রাখা হচ্ছে। গবেষণার তথ্য-উপাত্ত দেখে ডাটা সেফটি মনিটরিং বোর্ডের মতামতের প্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সিদ্ধান্ত নেয় বলেও জানান টেড্রোস।

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার এক সপ্তাহের মাথায় আবারও ওষুধটি প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইকোনোমিক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, হাইড্রোক্লোরোকুইন প্রয়োগ নিষিদ্ধ করার পর সার্জিস্ফিয়ারের গবেষণায় ত্রুটি ধরা পড়ায় মাত্রা ৯ দিনের মাথায় ৩ জুন সেটি আবার প্রয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়।

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যালয়ে ৩ জুন এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার মহাসচিব টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস জানান, সাবধানতার জন্য ওষুধটি প্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। এবং তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, হাউড্রোক্লোরোকুইন ব্যবহারের প্রথম থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল সেখানে পরিবর্তন আনার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ ওষুধটি প্রয়োগ করা যাবে।

কিন্তু এর মধ্যে সার্জিস্ফিয়ারের চালানো গবেষণার ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে গবেষণাটির বিশ্বাসযোগ্য দুর্বলতা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, সার্জিস্ফিয়ারের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাইড্রোক্লোরোকুইন ব্যবহার বন্ধ করে। কিন্তু তাদের গবেষণাটি সঠিক নয়। ফলে করোনা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভুল গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নড়বড়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে গবেষণার যেসব ত্রুটি ধরা পড়েছে সেখানে বলা হয়েছে, গবেষণার পপুলেশন সাইজ (এখানে রোগী ও হাসপাতালের সংখ্যা) যেটা বলা হয়েছে সেই পরিমাণ রোগী ও হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করার মতো জনবল সার্জিস্ফিয়ারের নেই। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ তিন ব্যক্তির মধ্যে কেউই এ বিষয়ে অভিজ্ঞও নন।

সার্জিস্ফিয়ারের তিনজন কর্মকর্তার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে যিনি সায়েন্স এডিটর তিনি মূলত একজন সায়েন্স ফিকশন লেখক ও ফ্যান্টাসি আর্টিস্ট। আর মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ এর যায়গায় একজন নারীর নাম রয়েছে তিনি একজন পর্নস্টার ও ইভেন্ট হোস্ট। প্রতিষ্ঠানটির মালিক স্বপন দেসাই। তার নামে ইতিপূর্বে তিনটি অপচিকিৎসা বিষয়ক মামলা ছিল। এই তিনজন জনবলেই নামমাত্র চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

গার্ডিয়ান বলছে, ওই প্রতিষ্ঠানের লিঙ্কডএন পেজে ১০০ এরও কম ফলোয়ার রয়েছে। সবশেষ তারা লিঙ্কডইনে গত সপ্তাহে কিছু তথ্য যুক্ত করেছে যেখানে ছয়জন কর্মীর তথ্য জানানো হয়েছে। অন্যদিকে তারা অন্যলাইনে তথ্য সংগ্রহের দাবি করলেও তাদের টুইটার হ্যান্ডেলে ফলোর সংখ্যা মাত্র ১৭০ জন। এবং ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তারা টুইটারে কোনো পোস্টই করেনি।

মে মাসের শেষ সপ্তাহেও দেখা গেছে সার্জিস্ফিয়ারের হোমপেজে গেট ইন টাচ অপশনে ক্রিপটোকারেন্সির একটি ওয়ার্ড প্রেস ওয়েবসাইট রিডিরেক্ট করা রয়েছে। ফলে বিশ্বের কোনো হাসপাতাল বা ব্যক্তির পক্ষে গেট ইন টাচের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে তাদের সঙ্গে হাসপাতালগুলো কিভাবে তথ্য লেনদেন করেছে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান।

গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে গবেষণাটির সহকারী লেখক  স্বপন দেসাই বলেন, এশিয়ার একটি হাসপাতালের তথ্য ভুলে অস্ট্রেলিয়া তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেছে।

তবে সংবাদমাধ্যমটি অস্ট্রেলিয়ার অন্তত পাঁচটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে যাদের তথ্য সার্জিস্ফিয়ারের উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ওই হাসপাতালগুলো জানিয়েছে, তারা সার্জিস্ফিয়ারের নামই কোনো দিন শোনেনি।

এদিকে গার্ডিয়ানের এই অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের পর সার্জিস্ফিয়ারের গবেষণার ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে  ল্যানসেট ও নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল। সূত্রঃ সময় সংবাদ।

এই জাতীয় আরো খবর

আপনার মতামত জানাতে পারেন।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.